
যোগিনী সাধনা - Yogini Sadhana

ভৈরবী,
নায়িকাদি অবিদ্যা এবং যোগিন্যাদি উপবিদ্যার সাধনায় ইহ সংসারে খ্যাতি-প্রতিপত্তির সহিত রাজার ন্যায় ভোগবিলাসে কালাতি-বাহিত করা যায়। কিন্তু অবিদ্যাসেবী ব্যক্তির অন্তে নরক অবশ্যম্ভাবী। বিশেষতঃ অবিদ্যাসেবায় বিপরীত বুদ্ধির উদয় হইয়া মনোবাসনা পূরণেও বিঘ্ন উৎপাদন করিয়া থাকে। দেশপ্রসিদ্ধ কালাপাহাড় দেবতা, ধৰ্ম্ম, গো ও ব্রাহ্মণের
রক্ষার নিমিত্ত অষ্টনায়িকার সাধন করিয়া কিরূপে দেবতা ও ধৰ্ম্ম রক্ষা
করিয়াছিল, তাহা কাহারও অবিদিত নাই। সুতরাং অবিদ্যা-বিমোহিত মানব-সমাজে অবিদ্যার সাধনাদি ব্যক্ত করা মঙ্গলজনক নহে। তবে উপবিদ্যাদি সাধনে সে ভয় নেই,
বরং তৎ-সাধনে প্রবৃত্তিপূর্ণ
ভোগবাসনা ক্ষয়ে মহাবিদ্যা সাধনে অধিকার লাভ করা যায়। তাই আমরা যোগিনী-সাধন বিবৃত করিলাম।
শাস্ত্রাদিতে
কথিত আছে, যোগিনীগণ জগজ্জনী জগদম্বার সহচারিণী। সুতরাং যোগিনী-সাধন করিয়া যেমন ভোগবাসনা পূর্ণ করা যায়, তদ্রূপ আবার তাঁহাদিগের সাহায্যে ইষ্ট-সাক্ষাৎকার লাভেও সাহায্য পাওয়া যায়। এই জন্য ভূতভাবন
ভবানীপতি প্রাণিবর্গের হিত-সাধনার্থ যোগিনী-সাধন প্রকাশ করিয়াছেন। যোগিনীর অর্চ্চনা করিয়া কুবের ধনাধিপতি হইয়াছেন। ইহাদিগের অর্চ্চনা করিলে মনুষ্য রাজত্ব পর্যন্ত লাভ করিয়া থাকে।
যোগিনীসকলের
মধ্যে আটজন প্রধানা। তাঁহাদের নাম যথা - সুরসুন্দরী, মনোহরা, কনকবতী, কামেশ্বরী, রতিসুন্দরী, পদ্মিনী, নটিনী ও মধুমতী। ইহাদিগের
এক একটার সাধনায় মানব অশেষ সুখ ও সম্পত্তির অধিকারী
হইয়া খ্যাতি-প্রতিপত্তির সহিত দীর্ঘকাল সংসারযাত্রা নির্ব্বাহ করিতে পারে। এই গ্রন্থে সকলগুলি
যোগিনীর সাধনপদ্ধতি বিবৃত করা অসম্ভব। আমরা কেবল সর্ব্বশ্রেষ্ঠ মধুমতী যোগিনীর সাধন-প্রণালী এই স্থলে ব্যক্ত
করিব। যে কোন একটি
যোগিনীর সাধন করিলেই সাধকের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইবে। তবে এই সর্ব্বসিদ্ধিপ্রদায়িনী মধুমতী দেবী
অতি গুহ্যা। একমাত্র ইহার সাধনায় মানবের সর্ব্বাভীষ্ট সিদ্ধ হইতে পারে এবং ইহার সাধনাও কিঞ্চিৎ সহজসাধ্য, তাই আমরা মধুমতী যোগিনীর সাধন-প্রণালীই প্রকাশ করিলাম।
ধীমান্
সাধক হবিষ্যাশী ও জিতেন্দ্রিয় হইয়া
যোগিনীসাধন করিবে। বসন্তকাল এই সাধনার উপযুক্ত
সময়। উজ্জটে অথবা প্রান্তরে এই সাধন করিবে,
বিশেষতঃ কামরূপে এই সিদ্ধিকার্য্য বিশেষ
ফলপ্রদ হয়। এই স্থানসকলের কোন
একটি স্থানে সর্ব্বদা যোগিনীকে ধ্যান করিয়া, তাঁহার দর্শনে সমুৎসুক হইয়া সুসংযত চিত্তে এই সাধন করিবে।
এইরূপ বিধানে সাধন করিলে নিশ্চয় দেবীর দর্শন লাভ করিতে পারিবে। যাহারা দেবীর সেবক, তাহারাই এই কার্য্যের অধিকারী;
ব্রহ্মোপাসক সন্ন্যাসিগণের এই কার্য্যে অধিকার
নাই।
ধীমান্
সাধক প্রাতঃকালে গাত্রোত্থান করিয়া স্নানাদি নিত্য ক্রিয়া সমাপনান্তে "হোঁ” এই মন্ত্রে
আচমন করিয়া "ওঁ সহস্রারে হুং ফট” এই
মন্ত্রে দিগ্বন্ধন করিবে। অনন্তর যথোপযুক্ত স্থানে সাধনার আয়োজন করিয়া পূজার দ্রব্যাদি আনয়ন করিবে। উত্তর কিম্বা পূর্ব্বমুখে যে কোন আসনে
উপবেশন পূর্ব্বক (এই কার্য্যে রঙ্গীন
কম্বলাসন প্রশস্ত) ভূর্জপত্রে কুমকুমদ্বারা ধ্যানানুযায়ী মধুমতীদেবীর প্রতিমূর্তি অঙ্কিত করিয়া তাহার বহির্ভাগে. অষ্টদল পদ্ম লিখিবে। অনন্তর আচমন, অঙ্গন্যাসাদি করিয়া সূর্য্যঃসোমঃ পাঠপূর্ব্বক স্বস্তিবাচন করিবে। তৎপরে সূর্য্যার্ঘ্য স্থাপন করিয়া প্রণাম করিবে। পরে মূল মন্ত্রে ১৬/৬৪।৩২ সংখ্যায়
তিনবার প্রাণায়াম করিয়া, হ্রাং, হ্রী', হুং, হৈং, হোং, জুঃ এই
মন্ত্রের দ্বারা অঙ্গন্যাস ও করন্যাস করিবে।
তৎপরে ভূর্জপত্রে অঙ্কিত মূর্ত্তিতে। জীবন্যাস দ্বারা প্রাণপ্রতিষ্ঠা এবং পীঠদেবতার আবাহন করিয়া মধুমতীর ধ্যান করিবে। ওঁ
শুদ্ধস্ফটিকসঙ্কাশাং নানারত্নবিভূষিতাং। মঞ্জীরহারকেয়ূর-রত্নকুণ্ডলমণ্ডিতাম্।।
এই মন্ত্রে ধ্যান করিয়া মূলমন্ত্রে দেবীর পূজা করিবে। মূলমন্ত্র উচ্চারণ পূর্ব্বক পাদ্যাদি প্রদান করিয়া ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য, গন্ধপুষ্প ও তাম্বুল নিবেদন করিবে। পূজাদি সামান্যপূজাপ্রকরণের প্রণালীতেই সম্পন্ন করিবে।
অনন্তর পূজা শেষ করিয়া পুনর্ব্বার প্রাণায়াম এবং অঙ্গ ও করন্যাস সমাধা করিয়া যোগিনীকে ধ্যান করতঃ জপের নিয়মানুসারে সমাহিত চিত্তে সহস্রবার জপ করিবে। তৎপরে পুনরায় প্রাণায়াম করিয়া দেবীর হস্তে জপফল সমর্পণ ও ভক্তিভাবে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করিবে। মধুমতী-মন্ত্র যথা-“মন্ত্রটি গোপন রাখা হল।” এই মন্ত্র গুরুর নিকট হইতে শুনিয়া লইতে পারিলে ভাল হয়।
এই সাধন কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ তিথিতে আরম্ভ করিয়া গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, দীপ, নৈবেদ্যাদি উপচারে ত্রিসন্ধ্যায় তিনবার দেবীর পূজা ও সহস্র সংখ্যক জপ করিবে। এইরূপে একমাস পূজা ও জপ করিয়া পূর্ণিমাতিথির প্রাতঃকালে ষোড়শোপচারে দেবীর পূজা করিবে। অনন্তর ঘৃত-প্রদীপ ও ধূপ প্রদান করিয়া দিবারাত্র মন্ত্র জপ করিতে থাকিবে। রাত্রে দেবী সাধককে নানারূপ ভয়প্রদর্শন করেন। তাহাতে সাধক ভীত না হইয়া জপ করিতে থাকিবে। দেবী সাধককে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ জানিয়া প্রভাতসময়ে সাধকের নিকট আগমন করেন। তখন সাধক পুনর্ব্বার ভক্তিভাবে পাদ্যাদি দ্বারা পূজা, উত্তম চন্দন ও সুগন্ধি পুষ্পমালা প্রদান করতঃ দেবীকে মাতা, ভগিনী, ভার্য্যা বা সখী সম্বোধন করিয়া বর গ্রহণ 'করিবে। পরে দেবী সাধককে অভিলষিত বর প্রদান করিয়া নিজালয়ে প্রস্থান করিবেন।
যোগিনী-সাধনায় সিদ্ধিলাভ করিলে দেবী প্রত্যহ রাত্রে সাধকের নিকট আগমন করিয়া রতি ও ভোজন দ্রব্য
দ্বারা তাহাকে পরিতোষিত করিয়া থাকেন। দেবকন্যা, দানবকন্যা, নাগকন্যা, যক্ষকন্যা, গন্ধর্ব্বকন্যা, বিদ্যাধরকন্যা, রাজকন্যা ও বিবিধ রত্ন-ভূষণ এবং চর্ব্যচোষ্যাদি নানা ভক্ষ্যদ্রব্য প্রদান করিয়া থাকেন। দেবীকে ভার্য্যারূপে ভজনা করিলে সাধক অন্য স্ত্রীর প্রতি আসক্তি পরিত্যাগ করিবে, নচেৎ দেবী ক্রুদ্ধা হইয়া সাধককে বিনাশ করিয়া থাকেন।
সাধক দেবীর প্রসাদে সর্ব্বজ্ঞ, সুন্দর-কলেবর ও শ্রীমান হইয়া নিরাময় দেহে দীর্ঘকাল জীবিত থাকে। সর্ব্বত্র গমনাগমনের শক্তি জন্মে। স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতালে যে সকল বস্তু বিদ্যমান আছে, দেবী সাধকের আজ্ঞানুসারে তৎসমস্ত আনিয়া তাহাকে অর্পণ করেন এবং প্রতিদিন প্রার্থিত সুবর্ণ মুদ্রা প্রদান করিয়া থাকেন। প্রতিদিন যাহা পাইবে, সেই সমুদয় ব্যয় করিবে, কিঞ্চিন্মাত্র অবশিষ্ট থাকিলে দেবী কুপিতা হইয়া আর কিছু প্রদান করেন না। সাধক এইরূপে যোগিনীসাধন করিয়া প্রতিদিন দেবীর সহিত ক্রীড়াকৌতুকাদি করতঃ সুখে জীবন-যাপন করিয়া থাকে।
0 মন্তব্যসমূহ