
তন্ত্র শাস্ত্রে 'উচাটন' হলো ষটকর্মের (শান্তি, বশীকরণ, স্তম্ভন, বিদ্বেষণ, উচাটন ও মারণ) অন্যতম একটি প্রধান অভিচার ক্রিয়া। সহজ কথায়, কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর মনকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বিচলিত বা উৎপাটিত করার প্রক্রিয়াকেই উচাটন বলা হয়।
তন্ত্র
মতে,
উচাটন
ক্রিয়ার মাধ্যমে মূলত
নিম্নলিখিত কাজগুলো বা
প্রভাব
বিস্তার করা
হয়ে
থাকে:
মনকে চঞ্চল ও উদাসীন করা
উচাটন
ক্রিয়ার মূল
লক্ষ্য
হলো
লক্ষ্যবস্তুর (নির্দিষ্ট ব্যক্তির) মানসিক
স্থিরতা নষ্ট
করা।
এর
ফলে
ব্যক্তি কোনো
একটি
নির্দিষ্ট স্থানে
বা
কাজে
মনঃসংযোগ করতে
পারে
না।
তার
মধ্যে
এক
ধরনের
তীব্র
ছটফটানি, উদাসীনতা বা
মানসিক
অস্থিরতা তৈরি
হয়।
স্থান পরিবর্তন বা গৃহত্যাগ করানো
যদি
কোনো
ব্যক্তিকে তার
বর্তমান বাসস্থান, কর্মক্ষেত্র বা
সমাজ
থেকে
দূরে
সরিয়ে
দেওয়ার প্রয়োজন হয়,
তবে
এই
ক্রিয়া প্রয়োগ করা
হয়।
ব্যক্তি নিজের
অজান্তেই সেই
স্থানটির প্রতি
চরম
বিতৃষ্ণাবোধ করে
এবং
সেখান
থেকে
পালিয়ে যাওয়ার বা
স্থান
পরিবর্তন করার
সিদ্ধান্ত নেয়।
আসক্তি বা মোহভঙ্গ করা
কোনো
ব্যক্তি যদি
কোনো
ক্ষতিকর অভ্যাস,
খারাপ
সঙ্গ
বা
অনৈতিক
সম্পর্কের প্রতি
অতিরিক্ত আসক্ত
হয়ে
পড়ে,
তবে
সেই
আসক্তি
দূর
করতে
উচাটন
প্রয়োগ করা
হয়।
এর
ফলে
সংশ্লিষ্ট বিষয়
বা
ব্যক্তির প্রতি
তার
মোহ
কেটে
যায়
এবং
সে
সেখান
থেকে
মন
ফিরিয়ে নেয়।
শত্রু দমনে বা শত্রুকে তাড়াতে
শত্রু
যদি
অন্যায়ভাবে কোনো
জায়গায় আধিপত্য বিস্তার করে
বা
ক্ষতি
করার
চেষ্টা
করে,
তবে
তাকে
সেই
স্থান
থেকে
তাড়ানোর জন্য
বা
তার
মনোযোগ
অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে
এই
ক্রিয়া ব্যবহার করা
হয়।
এর
ফলে
শত্রু
নিজের
সমস্যায় এতটাই
ব্যস্ত
হয়ে
পড়ে
যে
অন্যের
ক্ষতি
করার
সময়
বা
মানসিকতা হারায়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: সনাতন তন্ত্র শাস্ত্র ও আধ্যাত্মিক দর্শন অনুযায়ী, যেকোনো তন্ত্র ক্রিয়ার ফলাফল নির্ভর করে প্রয়োগকারীর উদ্দেশ্য ও কর্মফলের (Karma) ওপর। সৎ উদ্দেশ্যে, যেমন—কাউকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনা বা আত্মরক্ষার জন্য এই ধরনের বিদ্যা আলোচনার সুযোগ থাকলেও, কারো অন্যায় ক্ষতি বা ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে নেতিবাচক প্রয়োগ সর্বদা বর্জনীয় এবং এর বিপরীত প্রতিক্রিয়া নিজের ওপর আসার তীব্র ঝুঁকি থাকে।
তন্ত্র শাস্ত্রে উচাটন ক্রিয়ার তাত্ত্বিক ভিত্তি এবং প্রাচীন গ্রন্থসমূহে এর যে বিবরণ
পাওয়া যায়, তা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট।
এই ক্রিয়ার পেছনে মূলত মনস্তাত্ত্বিক উপাদান এবং পঞ্চভূতের বায়ু তত্ত্বের প্রভাব কাজ করে।
নিচে উচাটন ক্রিয়ার প্রাচীন গ্রন্থভিত্তিক তত্ত্ব এবং এর সাধারণ প্রয়োগের
নিয়মগুলো আলোচনা করা হলো:
প্রাচীন গ্রন্থে উচাটন ক্রিয়ার উল্লেখ
ভারতীয় তন্ত্রের মূল গ্রন্থসমূহ, যেমন—'শারদাতিলক তন্ত্র', 'মেরুতন্ত্র', 'দত্তাত্রেয় তন্ত্র' এবং 'অভিচার প্রকাশ'-এ ষটকর্মের অংশ
হিসেবে উচাটনের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
দেবতা ও দিক: তন্ত্র মতে, উচাটন ক্রিয়ার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন 'কালী'
বা 'ধূমাবতী' (কিছু গ্রন্থে দেবী তারা বা বায়ুরূপী দেবতাকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে)।
এই ক্রিয়ার জন্য সাধারণত বায়ব্য কোণ (উত্তর-পশ্চিম দিক) নির্ধারণ করা হয়, কারণ বায়ু
যেমন চঞ্চল এবং এক জায়গায় স্থির থাকে না, উচাটনের প্রকৃতিও ঠিক সেরকম।
ঋতু ও সময়: প্রাচীন গ্রন্থ অনুসারে, উচাটন কর্মের জন্য বর্ষা ঋতু এবং
দিনের তৃতীয় প্রহর (বিকেলের সময়) অথবা মধ্যরাত্রি সবচেয়ে উপযুক্ত বলে গণ্য করা হয়।
তাত্ত্বিক প্রয়োগ পদ্ধতি ও উপাদান
প্রাচীন গ্রন্থে উচাটন ক্রিয়ার জন্য নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম ও উপাদানের কথা
বলা হয়েছে, যা এই ক্রিয়ার
তীব্রতা বা চঞ্চলতা বাড়াতে
সাহায্য করে:
আসন ও মালা
আসন: উচাটন কর্মে সাধারণত পশুর চামড়া (বিশেষ করে হরিণ বা উটের চামড়া) অথবা চটের
আসন ব্যবহারের বিধান রয়েছে।
মালা: মন্ত্র জপের জন্য ঘোড়ার দাঁতের মালা, কাক বা শকুনের হাড়ের মালা অথবা রুদ্রাক্ষের
মালা ব্যবহার করা হতো, যা উগ্র শক্তির প্রতীক।
সমিধ ও হবন সামগ্রী
যজ্ঞ বা হবন করার
ক্ষেত্রে যে কাঠ (সমিধ)
ব্যবহার করা হয়, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উচাটনের জন্য সাধারণত ধুতুরা, নিম, বা আকন্দ গাছের কাঠ ব্যবহার করা হয়। হবন সামগ্রীতে সরিষার তেল, নিম পাতা, এবং ধুতুরার বীজ ব্যবহার করার উল্লেখ পাওয়া যায়।
মন্ত্র ও মুদ্রার প্রয়োগ
উচাটন মন্ত্রে সাধারণত "হূঁ" (Hum) বা "ফট" (Phat) বীজের আধিক্য থাকে। এই শব্দগুলো তীব্র
কম্পন এবং চঞ্চলতা সৃষ্টি করতে সক্ষম। জপ করার সময়
সাধারণত 'বায়ু মুদ্রা' বা 'তর্জনী মুদ্রা' ব্যবহার করা হয়।
সুরক্ষামূলক দৃষ্টিভঙ্গি ও সাবধানতা
প্রাচীন তন্ত্রাচার্যগণ সর্বদা একটি বিষয়ে সতর্ক করেছেন: উচাটন হলো একটি মানসিক অস্ত্র। এর অপপ্রয়োগ করলে
প্রয়োগকারীর নিজের মানসিক ভারসাম্যও নষ্ট হতে পারে। তাই প্রাচীন গ্রন্থে যেকোনো অভিচার ক্রিয়ার আগে আত্মরক্ষা বা 'কবচ' ধারণ করা বাধ্যতামূলক বলা হয়েছে।
আসুন এখন বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোন থেকে বিষয় টি দেখা যাক:
তন্ত্র শাস্ত্রে যেটিকে 'উচাটন' বা 'মানসিক শক্তি' (Mental/Psychic
Energy) বলা হচ্ছে, আধুনিক বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান (Psychology) এবং স্নায়ুবিজ্ঞান
(Neuroscience) সেটিকে
সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে এবং পরীক্ষিত তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করে।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি কোনো অলৌকিক বিষয় নয়, বরং আমাদের মস্তিষ্ক, হরমোন এবং তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গের এক জটিল সমন্বয়।
নিচে এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাগুলো
আলোচনা করা হলো:
মস্তিষ্কের তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ (Brainwaves)
আমাদের মস্তিষ্কে শত কোটি নিউরন
বা স্নায়ুকোষ রয়েছে। এই নিউরনগুলো যখন
একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে, তখন অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিদ্যুৎ তরঙ্গ সৃষ্টি হয়, যাকে ব্রেনওয়েভ বলা হয়। ইইজি (EEG) মেশিনের সাহায্যে এই তরঙ্গ মাপা
যায়।
মস্তিষ্কের প্রধান চারটি তরঙ্গের ভূমিকা নিচে দেওয়া হলো:
|
তরঙ্গের নাম |
কম্পাঙ্ক (Frequency) |
মানসিক অবস্থা |
উচাটন/ধ্যানের সাথে সম্পর্ক |
|
Beta ($\beta$) |
12 – 30 Hz |
তীব্র চিন্তা,
কাজের চাপ, অস্থিরতা |
উচাটন ক্রিয়ায়
মনের যে চঞ্চল অবস্থা হয়, তা এই বিটা তরঙ্গের অতি-সক্রিয়তার রূপ। |
|
Alpha ($\alpha$) |
8 – 12 Hz |
শান্ত, শিথিল
কিন্তু সচেতন অবস্থা |
ধ্যান বা
মন্ত্র জপের শুরুতে মন যখন শান্ত হয়। |
|
Theta ($\theta$) |
4 – 8 Hz |
গভীর ধ্যান,
সৃজনশীলতা, সম্মোহন (Hypnosis) |
অবচেতন মন
(Subconscious mind) যখন
সক্রিয় হয়। |
|
Delta ($\delta$) |
0.5 – 4 Hz |
গভীর ঘুম |
বাহ্যিক জগত
থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থা। |
যখন কেউ তীব্র মনোযোগ দিয়ে কোনো চিন্তা করে, তখন তার মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব (Frontal Lobe) থেকে নির্দিষ্ট তরঙ্গের নির্গমন ঘটে, যা তার নিজস্ব
মনস্তত্ত্বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
অবচেতন মনের শক্তি এবং 'টেলিপ্যাথি' (Telepathy)
মনোবিজ্ঞানী সিগমন্ড ফ্রয়েড এবং কার্ল ইয়ুং দেখিয়েছেন যে আমাদের মনের
মাত্র ১০% সচেতন (Conscious) এবং ৯০% অবচেতন (Subconscious)।
যুগ্ম অবচেতন মন (Collective Unconscious): কার্ল ইয়ুং-এর মতে, পৃথিবীর সব মানুষের অবচেতন মন এক অদৃশ্য স্তরে একে অপরের সাথে যুক্ত।
বিজ্ঞানের
ব্যাখ্যা: যখন কোনো ব্যক্তি তীব্র আবেগ বা মানসিক
শক্তি দিয়ে কারো কথা চিন্তা করে (যেমন উচাটন বা বশীকরণের তত্ত্বে বলা হয়), তখন কোয়ান্টাম
ফিজিক্সের কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট (Quantum Entanglement) তত্ত্বের মতো একটি পরোক্ষ
প্রভাবের কথা অনেকে ধারণা করেন। তবে সাধারণ বিজ্ঞান একে মূলত টেলিপ্যাথি বা মনস্তাত্ত্বিক
সংকেত আদান-প্রদান হিসেবে দেখে, যা মূলত অতি-সংবেদনশীলতার কারণে ঘটে থাকে।
হরমোন ও নিউরোট্রান্সমিটারের খেলা
তন্ত্রে উচাটন বলতে যে তীব্র ছটফটানি
বা মোহভঙ্গের কথা বলা হয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানে তা মূলত শরীরের
রাসায়নিক পরিবর্তন।
ডোপামিন (Dopamine): এটিকে বলা হয় 'রিওয়ার্ড হরমোন'। কোনো ব্যক্তি বা অভ্যাসের প্রতি তীব্র আসক্তি ডোপামিনের কারণে ঘটে।
কর্টিসল
ও অ্যাড্রেনালিন (Cortisol & Adrenaline): এগুলো হলো স্ট্রেস বা মানসিক চাপের হরমোন। কোনো কারণে মস্তিষ্কে কর্টিসলের মাত্রা
বেড়ে গেলে মানুষের মধ্যে তীব্র অস্থিরতা, অনিদ্রা এবং ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা
(Fight or Flight response) তৈরি হয়। প্রাচীন উচাটন ক্রিয়ার মনস্তাত্ত্বিক লক্ষ্য ছিল
অপর ব্যক্তির মধ্যে এই রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা বা স্ট্রেস তৈরি করা।
প্লেসবো এবং নোসেবো ইফেক্ট (Placebo & Nocebo Effect)
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম বড় আবিষ্কার হলো
মানুষের 'বিশ্বাস'-এর ক্ষমতা।
প্লেসবো ইফেক্ট: কোনো ব্যক্তি যদি বিশ্বাস করে যে একটি সাধারণ জল বা তাবিজ তাকে সুস্থ করে তুলবে, তবে তার মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাময়কারী রাসায়নিক নিঃসরণ শুরু করে এবং সে সুস্থ হয়ে ওঠে।
নোসেবো ইফেক্ট (উচাটনের
বৈজ্ঞানিক ভিত্তি): এটি প্লেসবোর ঠিক উল্টো। যদি কোনো ব্যক্তি জানতে পারে বা
গভীরভাবে বিশ্বাস করে যে তার ওপর কোনো 'অভিচার' বা কুপ্রভাব খাটানো হয়েছে, তবে তার
অবচেতন মন তীব্র ভয়ে বা আতঙ্কে কর্টিসল হরমোন নিঃসরণ শুরু করে। এর ফলে সে সত্যি সত্যিই
অসুস্থ, চঞ্চল বা মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়তে পারে। এখানে আসল শক্তিটি বাইরের কোনো
জাদুর নয়, বরং তার নিজের মস্তিষ্কের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার।
সারসংক্ষেপ:
প্রাচীন ঋষি ও তান্ত্রিকগণ মানুষের মনের এই অসীম ক্ষমতা এবং হরমোনের ওপর এর প্রভাব বুঝতে পেরেছিলেন। তাঁরা সেটিকে মন্ত্র, মুদ্রা ও প্রতীকের (Yantra) মাধ্যমে একটি কাঠামোগত রূপ দিয়েছিলেন। বিজ্ঞান বলে, মনকে একাগ্র করার মাধ্যমে নিজের শরীরের ভেতরের শক্তিকে (Bio-energy) জাগ্রত করা এবং অন্যের মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করা পুরোপুরি একটি মনস্তাত্ত্বিক ও জৈবিক প্রক্রিয়া।
আসুন আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে বিষয় টি দেখা যাক:
বাহ্যিক তন্ত্রে বা লৌকিক প্রয়োগে
উচাটন বলতে যা-ই বোঝানো
হোক না কেন, উচ্চমার্গের
আধ্যাত্মিক বা ‘অন্তস্তন্ত্রে’ (Internal
Tantra) উচাটন
হলো মূলত একটি অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর প্রক্রিয়া।
আধ্যাত্মিক সাধনায় উচাটন কোনো বাইরের মানুষকে তাড়ানোর জন্য নয়, বরং আমাদের ভেতরের ‘ষড়রিপু’ (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য) এবং নেতিবাচক মানসিক বৃত্তিকে তাদের আসন থেকে উৎপাটিত বা উচ্ছেদ করার
একটি তীব্র সাধনা।
নিচে আধ্যাত্মিক স্তরে এই অভ্যন্তরীণ উচাটনের
ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
কাম ও মোহের ওপর উচাটন (আসক্তি ভঞ্জন)
লৌকিক উচাটনে যেমন একজন মানুষকে অন্য জনের থেকে দূরে সরানো হয়, অন্তস্তন্ত্রে তেমনই কোনো বস্তুর প্রতি মানুষের যে তীব্র অন্ধ
আসক্তি বা ‘মোহ’ এবং জাগতিক লালসা বা ‘কাম’, তা থেকে মনকে
উচ্ছেদ করা হয়।
আধ্যাত্মিক ক্রিয়া: সাধক যখন বুঝতে পারেন কোনো নির্দিষ্ট আসক্তি বা মায়াজাল তাঁর আত্মিক উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তখন তিনি ধ্যান ও মন্ত্রশক্তির তীব্র কম্পন দিয়ে সেই আসক্তিকে মন থেকে ‘উচাটন’ বা বিতাড়িত করেন। একে বলা হয় বৈরাগ্য উদয়। মন তখন সেই মায়া থেকে ছটফট করে বেরিয়ে আসতে চায় এবং পরমাত্মার দিকে ধাবিত হয়।
ক্রোধ ও অহংকারের উচাটন (মানসিক রূপান্তর)
ক্রোধ এবং মদ (অহংকার) মানুষের চেতনার ওপর মেঘের মতো আবরণ তৈরি করে। এগুলো মানুষের সূক্ষ্ম বুদ্ধি ও বিবেককে স্তব্ধ
করে দেয়।
আধ্যাত্মিক ক্রিয়া: আধ্যাত্মিক উচাটন প্রক্রিয়ায় সাধক নিজের ভেতরের এই উগ্র শক্তিগুলোর দিক পরিবর্তন করে দেন। ক্রোধকে ধ্বংসাত্মক রূপ থেকে সরিয়ে সাধনার তীব্র শক্তিতে (Spiritual Intensity) রূপান্তরিত করা হয়। এর ফলে অহংকার নিজের আসন হারায় এবং সাধক অহং-মুক্ত বা বিনয়ী হয়ে ওঠেন।
লোভ ও মাৎসর্যের উচাটন (তৃপ্তি ও সমত্ব)
লোভ মানুষকে সর্বদা অতৃপ্ত রাখে এবং মাৎসর্য (ঈর্ষা) অন্যের ভালো দেখে নিজের ভেতর জ্বালা সৃষ্টি করে। এগুলো চিত্তকে সর্বদা চঞ্চল বা অস্থির করে
রাখে, যা আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানের
ভাষায় এক ধরণের নেতিবাচক
‘উচাটন’ অবস্থা।
অন্তস্তন্ত্রের চক্র এবং উচাটন বিজ্ঞান
আমাদের শরীরের শক্তির কেন্দ্র বা চক্রগুলোর সাথে
এই রিপুগুলোর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নিম্নমুখী চক্রগুলোতে (যেমন- মূলাধার ও স্বাধিষ্ঠান) কাম,
ক্রোধ এবং জাগতিক ভয় বা আসক্তি
বাস করে।
শক্তির
ঊর্ধ্বগমন:
সাধক যখন কুণ্ডলিনী শক্তি বা চেতনাকে নিচের
চক্রগুলো থেকে ওপরের দিকে তোলেন, তখন নিম্ন চক্রের নেতিবাচক বৃত্তিগুলোর ওপর এক ধরণের আধ্যাত্মিক
‘উচাটন’ ঘটে। অর্থাৎ, কাম-ক্রোধগুলো তাদের চেনা রাজত্ব বা আসন থেকে
চ্যুত হয়।
এর ফলে সাধকের বাহ্যিক জগতের প্রতি এক ধরণের সাময়িক
‘উদাসীনতা’ বা তীব্র বৈরাগ্য
আসে, যা লৌকিক উচাটনের
লক্ষণের মতোই, কিন্তু এর উদ্দেশ্য অত্যন্ত
পবিত্র—তা হলো আত্মোপলব্ধি।
সারকথা: প্রাচীন তন্ত্রের প্রকৃত রহস্য এটাই—যা কিছু বাইরে
ঘটে, তা আসলে ভেতরেই
বিদ্যমান ("যৎ পিণ্ডে তৎ ব্রহ্মাণ্ডে")। বাহ্যিক উচাটন
কেবলই ক্ষণস্থায়ী এবং কর্মফলের বন্ধন তৈরি করে। কিন্তু নিজের ভেতরের কাম, ক্রোধ, লোভ ও মোহকে মন
থেকে স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ বা উচাটন করতে
পারাটাই হলো সর্বোচ্চ এবং প্রকৃত তান্ত্রিক সিদ্ধি।
0 মন্তব্যসমূহ