
গুরু কে ?

গুরু হলেন সেই পথপ্রদর্শক, পরামর্শদাতা বা শিক্ষক, যিনি জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে শিষ্যকে অন্ধকার অর্থাৎ অজ্ঞতা থেকে আলোর বা প্রজ্ঞার পথে নিয়ে যান। সংস্কৃত 'গু' মানে অন্ধকার বা অজ্ঞতা এবং 'রু' মানে আলো বা ধ্বংসকারী, অর্থাৎ যিনি অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করে আধ্যাত্মিক ও জাগতিক জ্ঞান দান করেন, তিনিই গুরু।
গুরু কেবল সাধারণ শিক্ষক নন, তিনি পরামর্শদাতা, জীবনের আদর্শ, অনুপ্রেরণার উৎস এবং আধ্যাত্মিক বিবর্তনে সাহায্যকারী। ভারতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে গুরুকে দেবতার আসনে বসানো হয়।
বেদকাল থেকে গুরু-শিষ্য পরম্পরা বিদ্যমান। শিখ ধর্মে গুরু নানক ও তাঁর উত্তরসূরিরা আধ্যাত্মিক আলোকবর্তিকা হিসেবে বিবেচিত।
যিনি নিঃস্বার্থভাবে শিষ্য বা ভক্তের কল্যাণ কামনা করেন এবং করুণা থেকে শিক্ষা দেন, তিনিই প্রকৃত গুরু।
সহজ কথায়, যিনি আপনার সুপ্ত চেতনাকে জাগ্রত করে আপনাকে সত্যের পথ দেখান, তিনি গুরু।
গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু গুরুদেব মহেশ্বর গুরু সাক্ষাৎ পরমব্রহ্ম তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ।
এই শ্লোকটি সংস্কৃত ভাষার একটি গুরুস্তোত্র মন্ত্র। এর অর্থ হলো !
“গুরু
ব্রহ্মা, গুরু বিষ্ণু, গুরুদেব মহেশ্বর, গুরুই সাক্ষাৎ পরমব্রহ্ম, তাঁকে আমি প্রণাম করি।”
এই শ্লোকটির ব্যাখ্যা:
গুরু
ব্রহ্মা - গুরু সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার মতো, যিনি আমাদের জ্ঞান সৃষ্টি করেন।
গুরু
বিষ্ণু - গুরু পালনকর্তা বিষ্ণুর মতো, যিনি সেই জ্ঞানকে রক্ষা ও বিকাশ করেন।
গুরু
মহেশ্বর - গুরু সংহারক মহেশ্বরের মতো, যিনি অজ্ঞতা ও অন্ধকার দূর
করেন।
গুরু
সাক্ষাৎ পরমব্রহ্ম - গুরুই আসল পরম সত্য, সর্বোচ্চ ব্রহ্মতত্ত্বের প্রতিরূপ।
তস্মৈ
শ্রী গুরুবে নমঃ - সেই মহান গুরুদেবকে আমি প্রণাম জানাই।
মূলত
এই মন্ত্রে বলা হচ্ছে, গুরু শুধু শিক্ষক নন, তিনি সৃষ্টির, পালন ও সংহারের শক্তির
প্রতীক। গুরুই আমাদের কাছে ঈশ্বরের জীবন্ত রূপ, তাই তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া উচিত।
আসুন এই মন্ত্রের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য আরেকটু গভীরে ব্যাখ্যা করি — যেমন কেন গুরুকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। গুরুকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের সঙ্গে তুলনা করার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য আসলে খুব গভীর।
কেন গুরুকে
ব্রহ্মা
বলা
হয়
?
ব্রহ্মা
সৃষ্টিকর্তা। তিনি যেমন বিশ্ব সৃষ্টি করেন, গুরু আমাদের জীবনে জ্ঞান ও বোধের জন্ম
দেন। অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে মুক্ত করে নতুন চিন্তার সূচনা করেন।
কেন গুরুকে
বিষ্ণু
বলা
হয়
?
বিষ্ণু
পালনকর্তা। তিনি যেমন সৃষ্টিকে রক্ষা করেন, গুরু আমাদের অর্জিত জ্ঞানকে পালন ও সংরক্ষণ করেন।
শিষ্যের জীবনে সেই জ্ঞানকে স্থায়ী করে তোলেন, যাতে তা নষ্ট না
হয়।
কেন গুরুকে
মহেশ্বর
বলা
হয়
?
মহেশ্বর
বা শিব সংহারক। তিনি যেমন অশুভ ও অজ্ঞতার বিনাশ
করেন, গুরু আমাদের অহংকার, ভ্রান্তি ও অজ্ঞানতার ধ্বংস
করেন। ফলে শিষ্য সত্যের পথে এগিয়ে যায়।
গুরু সাক্ষাৎ
পরমব্রহ্ম
?
সবশেষে
বলা হয় গুরুই পরমব্রহ্ম।
অর্থাৎ গুরু কেবল দেবতাদের প্রতীক নন, তিনি সর্বোচ্চ সত্যের জীবন্ত রূপ। তাঁর মাধ্যমে শিষ্য ঈশ্বরতত্ত্বকে উপলব্ধি করে।
তাই
এই মন্ত্রে গুরুকে দেবতাদের সমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, কারণ গুরু ছাড়া ঈশ্বরতত্ত্ব উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। গুরুই সেই সেতু, যিনি মানুষকে অজ্ঞতা থেকে মুক্ত করে ব্রহ্মজ্ঞান পর্যন্ত পৌঁছে দেন।
0 মন্তব্যসমূহ