Ad Code

Ticker

6/recent/ticker-posts

বাস্তবে ভূত, প্রেত, জ্বীন, পরী এবং ডাকিনী, শাকিনী, যোগিনী এরা কারা ?

ভূত প্রেত জ্বীন পরী এরা কারা ?

ভূত, প্রেত, জ্বীন এবং পরীএরা হলো মানুষের কল্পনা, লোকগাথা বা বিভিন্ন ধর্মে উল্লেখিত অদৃশ্য বা অতিপ্রাকৃতিক জীব।

জ্বীন: ইসলাম ধর্ম মধ্যপ্রাচ্যের পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, এরা আগুন থেকে সৃষ্ট এক ধরণের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি সম্পন্ন জীব। মানুষের মতো এদেরও ভালো-খারাপ নির্বাচন করার ক্ষমতা আছে।

পরী: ফারসি আরবীয় লোকগাথা মতে, এরা সাধারণত অত্যন্ত সুন্দর কল্যাণকামী অতিপ্রাকৃতিক জীব বা আত্মিক সত্তা।

ভূত প্রেত: লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এরা হলো মৃত মানুষের অতৃপ্ত আত্মা বা অশুভ প্রেতাত্মা, যাদের কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই এবং মানুষের ক্ষতি করতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

বিজ্ঞান মনোবিজ্ঞান অবশ্য ধরনের অতিপ্রাকৃতিক সত্তার অস্তিত্ব স্বীকার করে না। মানসিক সমস্যা (যেমন: স্কিজোফ্রেনিয়া), আলো-ছায়ার খেলা বা অতি ভয়ের কারণে মানুষ অনেক সময় অমূলক ভয় বা দৃষ্টিভ্রমের শিকার হয়। ধর্মীয় লোকবিশ্বাস ছাড়া এগুলোর বৈজ্ঞানিক কোনো সত্যতা নেই।

ডাকিনী হাকিনী শাকিনী এরা কারা ?

হিন্দু বৌদ্ধ তন্ত্রশাস্ত্র অনুযায়ী ডাকিনী, হাকিনী শাকিনী হলেন আধ্যাত্মিক যোগিনী বা শক্তির বিভিন্ন রূপ, যা মানবদেহের বিভিন্ন চক্রের রক্ষয়িত্রী। পরবর্তীতে লোকসংস্কৃতিতে এদেরকে ভয়াল দর্শন বা রাক্ষসী হিসেবে কল্পনা করা হয়।

তন্ত্র অনুসারে মানবদেহের মূল সাতটি চক্রে সাতজন প্রধান যোগিনী অবস্থান করেন, যারা শক্তির জাগরণে সাহায্য করেন:

ডাকিনী: ইনি মূলাধার চক্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবী।

হাকিনী: ইনি আজ্ঞা চক্রের সাথে যুক্ত।

শাকিনী: ইনি বিশুদ্ধ চক্রের রক্ষয়িত্রী।

এঁরা সাধককে আধ্যাত্মিক পথে পরিচালিত করেন বলে তন্ত্রে উল্লেখ আছে। তবে জনপ্রিয় লোকবিশ্বাস কালীপূজার সময় মা কালীর দুই পাশে এদের ভয়াল অনুচর হিসেবে দেখানো হয়।

মা কালীর সহচর বা সঙ্গী হিসেবে প্রধানত ডাকিনী, যোগিনী, ভূত-প্রেত, এবং শ্মশানের জীবজন্তু (যেমন শৃগাল বা শিয়াল, শকুন)-কে ধরা হয়।

এই বিষয়টির প্রকৃত অর্থ হিন্দু তন্ত্র এবং দর্শনে গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বহন করে:

ডাকিনী যোগিনী: এগুলি মানুষের শরীরের বিভিন্ন সূক্ষ্ম নাড়ী বা অভ্যন্তরীণ শক্তির প্রতীক। সাধনার পথে এগুলি মন ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।

ভূত-প্রেত মৃত্যু: মা কালী শ্মশানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। শ্মশান হলো পার্থিব অহংকার, মোহ এবং সমস্ত জাগতিক বন্ধনের বিনাশের স্থান। তাঁর এই সহচরেরা প্রমাণ করে যে, মৃত্যুর পর জাগতিক সবকিছুর সমাপ্তি ঘটে এবং দেবী আমাদের মিথ্যা অহংকার ধ্বংস করেন।

প্রকৃত অর্থ: এই ভয়ংকর রূপ সহচরদের আসল উদ্দেশ্য ভয় দেখানো নয়, বরং এটি আত্মিক রূপান্তরের প্রতীক। কালী সমস্ত অশুভ শক্তি অজ্ঞানের বিনাশকারী। বাহ্যিক ভয়ংকর রূপের আড়ালে তিনি বিশ্বজননী, যিনি তাঁর সন্তানদের সমস্ত ভয় অন্ধকার থেকে মুক্ত করেন।

আসুন এখন তন্ত্রের অন্যান্য যোগিনী সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক ?

তন্ত্রশাস্ত্রে মানবদেহের মেরুদণ্ড বরাবর অবস্থান করা প্রতিটি শক্তির চক্রে (Chakra) একজন করে যোগিনী অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে থাকেন।

মূলাধার থেকে আজ্ঞা চক্র পর্যন্ত এই ছয়টি প্রধান চক্রের রক্ষয়িত্রী দেবী বা যোগিনীরা হলেন:

ডাকিনী: ইনি মেরুদণ্ডের গোড়ায় অবস্থিত মূলাধার চক্রের (Root Chakra) দেবী। ইনি চার হাত বিশিষ্ট এবং সাধককে পার্থিব জগতের মায়া কাটাতে সাহায্য করেন।       

রাকিনী: ইনি তলপেটে অবস্থিত স্বাধিষ্ঠান চক্রের (Sacral Chakra) রক্ষয়িত্রী। ইনি সাধকের যৌন সৃজনশীল শক্তিকে আধ্যাত্মিক পথে চালিত করেন।           

লাকিনী: ইনি নাভির পেছনে অবস্থিত মণিপুর চক্রের (Solar Plexus Chakra) দেবী। ইনি শারীরিক শক্তি এবং পরিপাক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন।

কাকিনী: ইনি বুকের কেন্দ্রে অবস্থিত অনাহত চক্রের (Heart Chakra) অধিষ্ঠাত্রী। ইনি ভক্তি, প্রেম মানসিক প্রশান্তি দান করেন।        

শাকিনী: ইনি কণ্ঠমূলে অবস্থিত বিশুদ্ধ চক্রের (Throat Chakra) রক্ষয়িত্রী। ইনি সাধককে বাকসিদ্ধি এবং উচ্চতর জ্ঞান অর্জনে সাহায্য করেন।   

হাকিনী: ইনি ভ্রু-যুগলের মাঝে অবস্থিত আজ্ঞা চক্রের (Third Eye Chakra) দেবী। ইনি সাধকের মনকে স্থির করে দিব্যদৃষ্টি এবং আত্মজ্ঞান দান করেন।

বাংলা লোকসংস্কৃতি কাল্ট (Cult):

পরবর্তীকালে লোকধর্মে এই যোগিনীরা অপদেবতা বা ডাইনি হিসেবে পরিচিতি পান। বিশেষ করে কালীপূজার সময় মা কালীর অনুচর হিসেবে ডাকিনী-যোগিনীদের রক্তপিপাসু ভয়ানক রূপের উল্লেখ মেলে। কিন্তু উচ্চতর হিন্দু বৌদ্ধ তন্ত্রে এঁরা মোটেও ক্ষতিকর নন, বরং আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক।

আপনি কি এই দেবী বা যোগিনীদের ধ্যানমন্ত্র এবং তাঁদের প্রতীকী রূপ (যেমন- তাঁদের গায়ের রং বা বাহন) সম্পর্কে জানতে চান, নাকি মা কালীর সাথে এঁদের সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত জানতে আগ্রহী?

এখন আমরা জানব বাস্তবে প্রকৃত এই দেবি কারা ?

তন্ত্রশাস্ত্র অনুযায়ী এই দেবীরা সাধারণ কোনো মৃত মানুষের আত্মা বা ভূত-প্রেত নন। এঁরা হলেন মহাজাগতিক আদি পরাশক্তি বা মা কালীর বিভিন্ন সৃষ্টিশীল আধ্যাত্মিক শক্তির অংশ (Emanations of Divine Energy)

সহজ ভাষায় বিষয়টি বুঝতে নিচের বিষয়গুলো লক্ষ্য করুন:

মহাজাগতিক শক্তি: হিন্দু দর্শনে মনে করা হয়, পরমেশ্বরী আদ্যাশক্তি যখন মহাবিশ্ব এবং মানুষের শরীর তৈরি করেন, তখন তিনি নিজের শক্তিকে বিভিন্ন রূপে ভাগ করেন। ডাকিনী, হাকিনী বা শাকিনী হলেন সেই শক্তিরই একেকটি রূপ।

দেহের রক্ষয়িত্রী: আমাদের শরীরের ভেতরে যে অদৃশ্য আধ্যাত্মিক শক্তির কেন্দ্র বা 'চক্র' রয়েছে, এঁরা সেই চক্রগুলোর এক একজন পাহারাদার বা দেবী। এঁদের কাজ মানুষের চেতনাকে নিচু স্তর থেকে উঁচুতে তোলা।

লোকবিশ্বাসের ভুল ধারণা: সাধারণ মানুষ বা লোকসংস্কৃতিতে সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে এঁদের 'ডাইনি', 'প্রেতাত্মা' বা 'অপদেবতা' বলে ভুল করা হয়। কিন্তু মূল তন্ত্রশাস্ত্রে এঁরা অত্যন্ত পবিত্র এবং পূজনীয়।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, এঁরা কোনো সাধারণ আত্মা নন, এঁরা হলেন ঐশ্বরিক মহাশক্তির বিভিন্ন রূপ এবং মানবদেহের ভেতরের আধ্যাত্মিক ক্ষমতার প্রতীক।

যোগিনী সম্পর্কে আরেকটু বিস্তারিত দেখে নাওয়া যাক ?

যোগিনী হলেন সনাতন ধর্ম এবং তন্ত্রশাস্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মহিলা আধ্যাত্মিক সাধিকা, শিক্ষক অথবা দিব্য নারী শক্তির একেকটি প্রকাশ. 'যোগী' শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ হলো 'যোগিনী'।

তন্ত্রশাস্ত্র, পুরাণ এবং ভারতীয় সংস্কৃতি অনুযায়ী যোগিনীদের প্রধানত ৪টি রূপে ব্যাখ্যা করা হয়:

উচ্চস্তরের আধ্যাত্মিক সাধিকা (Human Practitioners)বাস্তব জীবনে যেসব নারী কঠোর যোগসাধনা, তন্ত্র এবং আধ্যাত্মিকতায় সর্বোচ্চ সিদ্ধি লাভ করেন, তাঁদের যোগিনী বলা হয়. ভারত ও তিব্বতের ইতিহাসে এঁরা শ্রদ্ধেয় গুরু বা আধ্যাত্মিক শিক্ষিকা হিসেবে পরিচিত।

আদ্যাশক্তির বিভিন্ন রূপ (Divine Manifestations)তন্ত্রে যোগিনীদের দেবী পার্বতী বা মহাদেবীর বিভিন্ন আংশিক শক্তির রূপ মনে করা হয়. এঁরা সৃষ্টি ও ব্রহ্মাণ্ডের বিভিন্ন অলৌকিক ক্ষমতা ও শক্তি নিয়ন্ত্রণ করেন।

চৌষট্টি (৬৪) যোগিনী (The 64 Yoginis)তান্ত্রিক ঐতিহ্যে ৬৪ জন প্রধান যোগিনীর উল্লেখ পাওয়া যায়, যাঁরা মূলত মা কালীর সহচরী এবং দেবী দুর্গার যুদ্ধক্ষেত্রের প্রধান শক্তি।

আদি মহাশক্তির আটটি রূপ (অষ্টমাতৃকা) থেকে এই ৬৪ জন যোগিনীর উৎপত্তি. প্রাচীন ভারতে এঁদের সাধনার জন্য ছাদবিহীন বিশেষ গোলাকার মন্দির তৈরি হতো, যার কয়েকটি এখনো ভারতের ওড়িশা ও মধ্যপ্রদেশে অক্ষত আছে।

দেহের চক্রের রক্ষয়িত্রী (Guardians of Chakras)পূর্বের আলোচনায় যেমনটি বলা হয়েছে, মানবদেহের ভেতরের কুন্ডলিনী শক্তি জাগ্রত করার পথে প্রতিটি চক্র বা এনার্জি সেন্টারের পাহারা এবং সহায়তার দায়িত্বে থাকেন নির্দিষ্ট যোগিনীরা (যেমন- ডাকিনী, রাকিনী, হাকিনী ইত্যাদি)।

সহজ কথায়, যোগিনী কোনো ভূত-প্রেত বা ডাইনি নন; এঁরা হলেন জ্ঞানের প্রতীক, আধ্যাত্মিক শক্তির আধার এবং সাধনার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানো নারী শক্তি।

সংক্ষেপে -

ভূত, প্রেত, জ্বীন, পরী, ডাকিনী, হাকিনী, শাকিনী এবং যোগিনী হলো বিভিন্ন ধর্ম, লোকবিশ্বাস এবং তন্ত্রশাস্ত্র অনুযায়ী উল্লেখিত অতিপ্রাকৃত বা অশরীরী সত্তা। 

এদের পরিচয় সংক্ষেপে নিচে দেওয়া হলো:

ভূত ও প্রেত: লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, কোনো মানুষের মৃত্যুর পর তার অতৃপ্ত আত্মা যখন মুক্তি না পেয়ে পৃথিবীতে অশরীরী হিসেবে ঘুরে বেড়ায়, তখন তাকে ভূত বা প্রেত বলা হয়। সাধারণত অপঘাতে বা অসময়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের আত্মাকে প্রেতাত্মা মনে করা হয়।

জ্বীন: ইসলাম ধর্ম ও মধ্যপ্রাচ্যের লোকগাথা অনুযায়ী, জ্বীন হলো আগুন থেকে সৃষ্ট এক ধরনের অদৃশ্য জীব বা অতিপ্রাকৃত সৃষ্টি। মানুষের মতো এদেরও ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা ও ইচ্ছাশক্তি রয়েছে।

পরী: ইসলাম ধর্ম এবং পারস্য বা মধ্যপ্রাচ্যের লোকগাথায় পরীরা হলো অত্যন্ত সুন্দর, পবিত্র এবং ঐশ্বরিক ক্ষমতাসম্পন্ন বায়বীয় সত্তা। এরা সাধারণত মানুষের কল্যাণ করে থাকে।

ডাকিনী, শাকিনী ও যোগিনী: এঁরা সকলেই হিন্দু ধর্মীয় পৌরাণিক কাহিনী এবং তন্ত্রশাস্ত্রের সঙ্গে জড়িত।

যোগিনী: তন্ত্রমতে এরা ৬৪ জন শক্তিশালী দেবী বা মাতৃকার একটি দল, যারা মহাশক্তি বা মা কালীর সহচরী ও অংশ হিসেবে গণ্য হন। পুরাণে অসুরদের সঙ্গে দেবী দুর্গার যুদ্ধের সময় এদের সৃষ্টি বলে উল্লেখ আছে।

ডাকিনী ও শাকিনী: এরাও মূলত দেবী কালীর বা তন্ত্রের উগ্র প্রকৃতির সহচরী। লোকমুখে এদের অনেক সময় ডাইনি বা অশুভ আত্মা হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়।

হাকিনী: যোগিনীদের মতোই হাকিনী হলো তান্ত্রিক ধারণার সাথে জড়িত একটি সত্তা, যা মানবদেহের 'আজ্ঞা চক্র' বা ভ্রুর মধ্যবর্তী স্থানের শক্তির সাথে সম্পর্কযুক্ত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Ad Code